অটিজম্ নির্ণয়ের পর


শিশুদের ‘অটিজিম্ স্পেক্ট্রাম ডিসঅর্ডার’ থাকলে, আমাদের দেশে এখন বেশ ছোট বয়সেই নির্ণিত হচ্ছে – যেমন শিশুর ২ থেকে ৪ বছরের মধ্যে। তবে শিশুর অ্যাসপারগার সিনড্রোম্ থাকলে, সাধারণতঃ তার ৫ বছর বয়সের আগে বা সে স্কুলে যাওয়া শুরু না করলে, সেইটি নির্ণয় নাও হতে পারে।

কোনও শিশুর অটিজিম্ নির্ণয় চলাকালীন দিনগুলি এবং তা নিণর্য়ের ঠিক পরের কিছুটা সময় তার পরিবারের পক্ষে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও দুঃখময় হতে পারে। তবে ধীরে ধীরে সকলে এইটি মেনে নিতে চেষ্টা করেন। নানারকম মানসিক অনুভূতি ও চিন্তার সম্মুখীন হতে হয় তাঁদের। একদিকে আশানুরূপ ‘সাধারণ’ সন্তান না পাবার দুঃখ তাঁদের মনকে বিচলিত করে, অন্যদিকে সন্তানের আলাদা হবার কারণটি জানতে পেরে হয়তো মন কিছুটা শান্ত হতে পারে।

সন্তানের অটিজিম্ নির্নয় হবার কোন পথে এগোবেন, এই বিষয়ে মা-বাবাকে কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হয় – কারণ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা, হিতৈষীরা অথবা বিশেষজ্ঞরা যেসব পরামর্শ দেবেন, সেইগুলি হয়তো আলাদা আলাদা ধরণের হতে পারে। সন্তানের উপযোগী পরিসেবা কোথায় পাবেন – এই চিন্তায় মনে হতাশা আসাও অস্বাভাবিক নয়।

পরিষেবার সন্ধানে থাকার সময়ে শিশুটিকে সাহায্য করার জন্য কিছু কাজ করা যেতে পারে :-

  • এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলুন, যেখানে শিশুটি কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাও নিতে পারবে, যেমন – সুপরিকল্পিত কৌশলে বাড়িটিকে গুছিয়ে নেবেন, যাতে তার অবাঞ্ছিত আচরণগুলি প্রকাশ পেতে না পারে। উদাহরণ :- যদি শিশুটির জিনিষপত্র ফেলে বা ভেঙে দেবার অভ্যাস হয়ে থাকে, তার হাতের কাছ থেকে সেইসব সরিয়ে রাখা ভালো।
  • বিশেষ বিশেষ কাজগুলি যথোপযোগী জায়গায় করতে হবে, যেমন – বাড়ির প্রত্যেকে খাবার নিদির্ষ্ট জায়গায় খেতে বসবেন। একটি মাদুর বা সতরঞ্চী বিছিয়ে একটি জায়গা চিহ্নিত করে দিন, যেখানে শিশুটি খেলতে বা তার যা মন চায় করতে পারে। তবে লক্ষ রাখতে হবে, যে শিশু যা করছে সেইটি যেন বিপজ্জনক বা ক্ষতিকারক না হয়।
    শিশুটি কথা বলতে পারুক বা না পারুক, সহজ, সরল ছোট ছোট বাক্যে তার সঙ্গে কথা বলবেন। যে কোনও নিদের্শ ভেঙে ভেঙে ছোট করে দেবেন। উদাহরণ :-
    “অমিত —– উঠে দাঁড়াও —- জুতো পরে নাও।“
  • যদি আপনার নিদের্শ অনুসারে শিশুটি কাজ না করতে পারে, তাকে মোটেই বকাবকি করবেন না। শান্ত ভাবে তাকে সেই কাজটি করতে সাহায্য করুন।
    শিশু যদি কোনও অনুপযুক্ত কাজ বা আচরণ করে, তাকে “কি করবে না” (না সূচক) না বলে, সে “কি করবে” (হ্যাঁ সূচক) স্পষ্ট ভাষায় সেইটি বলে দিতে হবে। উদাহরণ :-
    সে যদি কল খুলে জল ঘাঁটে, তাকে “কল খুলো না” না বলে, বলবেন “কল বন্ধ করে দাও”। বাড়িতে বেশী ছুটোছুটি করলে “ছুটোছুটি করো না” না বলে, বলবেন “চেয়ারে (বা অন্য কোথাও) বস”।
  • আপনার কথা শুনলে বা উপযুক্ত কোনও কাজ করলে, সঙ্গে সঙ্গে তার প্রশংসা করবেন এবং কি কারণে তার প্রশংসা করলেন, সেইটি তাকে পরিস্কার ভাবে জানিয়ে দেবেন। উদাহরণ :-
    (আগের উদাহরণের পরিপ্রেক্ষিতে) সে কল বন্ধ করে দিলে তাকে বলবেন – “পিন্টু বড় ভালো ছেলে, কি সুন্দর ভাবে কলটা বন্ধ করলো”, বা পিন্টু কি লক্ষ্মী ছেলে, কেমন কথা শুনে চেয়ারে বসে পড়লো”।
  • শিশুকে কথা বলা শিখতে সাহায্য করুন। সে কিছু চাইলে, জিনিষটির নামটুকু শুধু বলে, তারপর সেইটি তাকে দিন। তাকে কোনও মতেই জোর করে কথা বলাবার চেষ্টা করবেন না।
    শিশুটির উচ্চতা বরাবর ঝুঁকে, তার কাছে এসে কথা বলবেন।
  • শিশুটি নিজের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে যেমন ভাবে খেলতে চাইবে তার সঙ্গে সেইভাবে খেলা করুন। তার পছন্দের জিনিস নিয়ে তার সঙ্গে খেলা করবেন। আস্তে আস্তে নতুন খেলার জিনিষ খেলার মধ্যে যোগ করবেন।

অটিজিম্ অথবা অ্যাসপারগার সিনড্রোম সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করতে হবে .অটিজিম্ অথবা অ্যাসপারগার সিনড্রোম সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করুন। অটিজিম্-য়ের বিষয়ে (ধরণ) জানতে পারলে শিশুটির বিভিন্ন আচরণ প্রকাশ পাবার কারণ বোঝা যাবে। ছোট বয়স থেকেই অটিজিম্-য়ের উপযোগী সুনির্দিষ্ট শিক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার করলে শিশুর শিখতে সুবিধা হবে এবং কোনও কাজে সে পিছিয়ে থাকলে, সেই কাজে তার কর্মদক্ষতা বাড়বে।
আপনার এলাকায় ‘পেরেন্ট সার্পোট গ্রুপ’-য়ে যোগ দিন। যদি আপনার এলাকায় এ ধরণের সংগঠন না থাকে, তাহলে এইসব মা বাবাদের একত্রিত করে একটি সংগঠন গড়ে তুলুন।

সম্ভব হলে প্রমাণ ভিত্তিক অটিজিম্ পরিচালনার উপযুক্ত পদ্ধতির সন্ধানে থাকুন। যত তাড়াতাড়ি শিশুর ক্ষেত্রে সুনিদির্ষ্ট শিক্ষাপ্রণালী ব্যবহার করবেন, তত তাড়াতাড়ি তার অবস্থার উন্নতি হবে।

অটিজিম্-য়ের উপযুক্ত পরিচালনা ও যথাযথ শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসন্ধান করার সময় মনে রাখতে হবে যে, এই প্রতিবন্ধকতার সুপরিচিত শিক্ষা পদ্ধতিগুলি – আচরণের যুক্তিসম্মত মূল নীতির ওপর গঠন করা হয়। নীচে যে শিক্ষা পদ্ধতিগুলি বিবরণ দেওয়া আছে – বলা যেতে পারে, সেই সবগুলির কিছু কিছু নিয়ম বা পন্থা একটি সুপরিকল্পিত শিক্ষাসূচীর মধ্যে অবশ্যই থাকবে। এই প্রণালীগুলি প্রয়োজন মতো মিলিয়ে মিশিয়ে, প্রত্যেকটি শিশুর ক্ষেত্রবিশেষে যথাযথ ব্যবহার করলে সুফল পাওয়া যাবে।

Copyright ©2018 Autism Society West Bengal : All Rights Reserved
Site Designed and Developed by Tuli E Services